ঢাকা : সারা দেশে নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার চিত্র বেড়েই চলেছে। নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার যে ভয়াবহ চিত্র প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় উঠে আসছে, তারই একটি সামগ্রিক চেহারা তুলে ধরেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।
সংগঠনটির কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদে সংরক্ষিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই ৭৭৬ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, হত্যা, আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু, পাচার, অপহরণ, যৌতুক, সাইবার সহিংসতা সব ক্ষেত্রেই উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবাদপত্রে প্রকাশিত ঘটনাগুলো কেবল ‘দৃশ্যমান অংশ’। বাস্তবে নির্যাতনের সংখ্যা আরও বেশি। কারণ সামাজিক লজ্জা, ভয়, প্রভাবশালীদের চাপ এবং বিচারহীনতার কারণে বহু পরিবার ঘটনাই প্রকাশ করতে চায় না।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট ২ হাজার ৮০৮ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়। আর ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল, এই চার মাসেই সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭৬। অর্থাৎ, বছরের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ সময়ে গত বছরের মোট ঘটনার প্রায় ২৮ শতাংশ ইতোমধ্যে ঘটে গেছে।
২০২৫ সালে নির্যাতনের সবচেয়ে বড় অংশ ছিল ধর্ষণ ও হত্যা। একই ধারা দেখা যাচ্ছে চলতি বছরেও। বরং কিছু ক্ষেত্রে সহিংসতার মাত্রা আরও বেড়েছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে সহিংসতার হার সবচেয়ে বেশি। মার্চে ১৯০ এবং এপ্রিলে ২২০ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এই প্রবণতা উদ্বেগজনক। কারণ বছরের শুরুতেই সহিংসতার ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে।
২০২৫ সালে ধর্ষণের শিকার হয় ৭৮৬ জন নারী ও কন্যা। তাদের মধ্যে ৫৪৩ জনই কন্যাশিশু। অর্থাৎ মোট ভুক্তভোগীর প্রায় ৭০ শতাংশ শিশু। একই বছরে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন ১৭৯ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৩১ জনকে।
চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৭৮ জন নারী ও কন্যা। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৩১, ফেব্রুয়ারিতে ৩২, মার্চে ৫৭ এবং এপ্রিলে ৫৮ জন। চার মাসে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬২ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ জনকে। এছাড়া অন্তত ২৭ জন ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ধর্ষণ এখন কেবল অপরাধ নয়, ক্ষমতার প্রদর্শনেও ব্যবহৃত হচ্ছে। অপরাধীরা জানে, দ্রুত বিচার হবে না। এ কারণেই ভয় কমে গেছে।
ইনোভেশন ফর অল বিইং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মনিরা রহমান বলেন, যৌন সহিংসতার শিকার শিশুদের বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমায় ভোগে। অনেকেই বিষণ্নতা, আত্মহত্যাপ্রবণতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত হয়।
২০২৫ সালের প্রায় সব ধরনের সহিংসতায় কন্যাশিশুর উপস্থিতি উদ্বেগজনক। ধর্ষণ, অপহরণ, পাচার, যৌন নিপীড়ন, সাইবার সহিংসতা সব ক্ষেত্রেই শিশুদের সংখ্যা বেশি। ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ধর্ষণের পাশাপাশি যৌন নিপীড়ন, উত্ত্যক্তকরণ এবং পাচারের ঘটনাগুলোর বড় অংশের শিকার কন্যাশিশু।
অধিকারকর্মীদের মতে, পরিবার ও সমাজের ভেতরে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে পরিচিতজন, আত্মীয় বা প্রতিবেশীরাই অপরাধী।
বিশেষজ্ঞ ও নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে রয়েছে মামলার দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, সামাজিক লজ্জা ও নীরবতা, অনলাইন সহিংসতার বিস্তার, নারীবিদ্বেষী মানসিকতা এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তাহীনতা।
তাদের মতে, অনেক ঘটনায় মামলা হলেও বিচার শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগে। ফলে অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় কমে যাচ্ছে। অনেক ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারও নিরাপত্তার অভাবে মামলা করতে চান না বা মাঝপথে আপস করতে বাধ্য হন।
নারী অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। থানায় জেন্ডার সংবেদনশীল ডেস্ক আরও কার্যকর করতে হবে, যাতে ভুক্তভোগীরা নিরাপদভাবে অভিযোগ জানাতে পারেন। কন্যাশিশুর নিরাপত্তায় স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সাইবার অপরাধ দমনে বিশেষ ইউনিটকে আরও সক্রিয় করতে হবে। নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের জন্য আইনি সহায়তার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেতারা বলছেন, সংবাদপত্রে প্রকাশিত ঘটনাগুলোই যদি এত ভয়াবহ হয়, তাহলে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা এখন শুধু মানবাধিকার নয়, রাষ্ট্রের সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সহিংসতার এই চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে।
এ সংগঠনের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, দেশে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ধর্ষণের ঘটনায় শিশু ভুক্তভোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।আমরা যে তথ্যগুলো দেখছি, তাতে স্পষ্ট কন্যাশিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
ফওজিয়া মোসলেমের মতে, দায়মুক্তির সংস্কৃতি নারী ও শিশু নির্যাতনের অন্যতম বড় কারণ। অনেক ঘটনায় অপরাধীরা দ্রুত গ্রেপ্তার হয় না, বিচার প্রক্রিয়াও দীর্ঘ হয়। ফলে অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু ক্ষেত্রে অবহেলা এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ও সহিংসতা বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, যখন অপরাধীরা দেখে যে প্রভাব খাটিয়ে বা দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে পার পাওয়া সম্ভব, তখন তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে দ্রুত বিচার এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় সরকারের কর্মপরিকল্পনায় বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর পদক্ষেপ থাকতে হবে। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, সেই আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি মনে করেন, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে শুধু সরকারের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এ জন্য নাগরিক সমাজ, নারী ও শিশু অধিকার সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাসহ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এছাড়াও সমাজে পরিষ্কার বার্তা পৌঁছাতে হবে যে, নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়িত কেউই ছাড় পাবে না। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
ফওজিয়া মোসলেম সরকারকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বসে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্কুলভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং অনলাইন নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি। একটি শিশুও যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে সেটি পুরো সমাজের ব্যর্থতা। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন শুধু মানবাধিকার নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের বড় দায়িত্ব।
এসআইপি/এনডি/এএস



