সাতক্ষীরা: ইটভাটা, শিল্পকারখানা, মাছের ঘের আর অবৈধ বসতির গ্রাসে সংকুচিত হয়ে পড়েছে সাতক্ষীরার জীবনরেখা কপোতাক্ষ, ইছামতি ও বেতনা নদী। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ হওয়ায় প্রতি বছরই বর্ষায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছেন জেলাবাসী। এই সংকট নিরসনে এবার কঠোর অবস্থানে জেলা প্রশাসন।
নদী ও নৌ-খাল দখল মুক্ত করতে প্রস্তুত করা হয়েছে ৩০২ জন অবৈধ দখলদারের চূড়ান্ত তালিকা এবং তাদের উচ্ছেদে হাতে নেওয়া হয়েছে ৫০ দিনের বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের নির্দেশনায় মাঠপর্যায়ে সরেজমিন তদন্ত ও পুনঃযাচাই শেষে জেলা প্রশাসন এই তালিকা চূড়ান্ত করে কমিশনের ওয়েবসাইট ও জেলা প্রশাসনের পোর্টালে প্রকাশ করেছে।
জেলা প্রশাসনের নথিপত্র ও সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নদীর সীমানা ও জায়গা দখল করে কোথাও গড়ে উঠেছে বিশাল শিল্পকারখানা, আবার কোথাও ইটভাটা, মাছের ঘের কিংবা স্থায়ী বাড়িঘর।

সদর উপজেলার বাবুলিয়া মৌজায় কপোতাক্ষ ও সংলগ্ন এলাকায় ‘কামরুল এসবিবি’ ও ‘মনির এসবিএল’ নামে দুটি ইটভাটা নদী দখল করে পরিচালিত হচ্ছে। তালিকায় দেখা যায়, এ দুটি ভাটার দখলে রয়েছে প্রায় ২ বিঘা ৮ কাঠা নদীর জমি।
শহরের অদূরে বিনেরপোতা এলাকায় বেতনা নদীর এক পাশে মৃতপ্রায় জলধারা, আর অন্য পাশে সীমানাপ্রাচীর তুলে গড়ে উঠেছে ‘হাসান ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড’। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১.১৮৭ বিঘা নদীর জমি অবৈধভাবে দখল করে অবকাঠামো নির্মাণ করেছে।
তালা উপজেলার মাগুরা, জগদানন্দকাটি, পুটিয়াখালী, রাজেন্দ্রপুর ও জালালপুর মৌজায় কপোতাক্ষ নদীর জমি দখল করে শতাধিক পরিবার স্থায়ী-অস্থায়ী ঘরবাড়ি ও পুকুর নির্মাণ করেছে। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি খালে নেট-পাটা দিয়ে ধান ও মাছ চাষ চলায় খালের অস্তিত্বই বিলীন হতে বসেছে।
জলবদ্ধতা নিরসনে ইতোমধ্যে বাইপাস সড়কসংলগ্ন খাল থেকে নেট-পাটা ও ময়লা অপসারণের কাজ শুরু করেছে প্রশাসন। বড় অবৈধ স্থাপনাগুলোতে চূড়ান্ত নোটিশ জারি করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ জানান, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পানি চলাচলের পথ পরিষ্কারের কাজ চলছে। বড় অবৈধ স্থাপনাগুলো আইন অনুযায়ী নোটিশ দিয়ে উচ্ছেদ করা হবে। নদী বা খাল দখলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
তবে সাধারণ নাগরিকরা ৫০ দিনের এই বিশেষ উচ্ছেদ অভিযান বাস্তবায়নে প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখছেন।নদীর জমিতে বসবাসকারী প্রকৃত ভূমিহীন পরিবারগুলোর যথা সমযে পুনর্বাসন করা না গেলে এই অভিযান পূর্বের ন্যায় কঠিন হযে পড়বে।
আর মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় জনবল ও লজিস্টিক সংকট বাড়াতে হবে জেলা প্রশাষনের।।তাছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করা যারা নদীর চর দখল করে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান ও দোকান পাট গড়ে তুলেছেন তাদেরকে হটানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করেন সাধারণ নাগরিকরা।
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি তৈয়ব হাসান সামছুজ্জামান বাবু ও পরিবেশ আন্দোলনের নেতারা বলেন, নদী ও খালগুলোকে দখলমুক্ত করা গেলে সাতক্ষীরার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলবে। তবে অতীতেও তালিকা হলেও প্রভাবশালী দখলদাররা থেকে গেছে অধরা। নাগরিক সমাজের দাবি—প্রশাসন যেন কোনো আপস না করে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে এই অভিযান সফল করে।
ওএনবি/আব্দুল মোমিন/জেএফজে



