বুধবার, ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১লা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ৫ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

ভিডিও কেলেঙ্কারিতে পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনের করুণ পতন এমপি গাজীর

ভিডিও কেলেঙ্কারিতে পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনের করুণ পতন এমপি গাজীর

সাতক্ষীরা: উপকূলীয় জনপদ সাতক্ষীরার শ্যামনগরে রাজনীতিতে এক সুপরিচিত নাম গাজী নজরুল ইসলাম। ছাত্ররাজনীতি, মহান মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষকতা থেকে শুরু করে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসা—দীর্ঘ পাঁচ দশকের এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার তাঁর।

তিনবার সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হওয়ার কৃতিত্বও রয়েছে এই নেতার ঝুলিতে। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় একটি বিতর্কিত ভিডিও তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে লেপে দিয়েছে চূড়ান্ত কালিমা। ‘নৈতিক স্খলনের’ অভিযোগে শেষ পর্যন্ত নিজ দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন তিনি।

​যেভাবে বিতর্কের শুরু ও বহিষ্কার

গত ২০ জুলাই রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমপি গাজী নজরুলের একটি স্পর্শকাতর ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। ভিডিওতে থাকা নারীকে তিনি নিজের ‘বৈধ দ্বিতীয় স্ত্রী’ বলে দাবি করলেও তাতে জনমনে তৈরি হওয়া বিতর্ক থামেনি।

এর জেরে ২২ জুলাই দুপুরে শ্যামনগর বাজারে ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

পরিস্থিতি অনুধাবন করে একই দিন বিকেলে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ জরুরি বৈঠক ডাকে। ওই বৈঠকেই নৈতিক স্খলনের দায়ে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

​দলের এই কঠোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে স্থানীয় নেতৃত্ব। সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আজিজুর রহমান জানান, জামায়াত একটি নৈতিকতাসম্পন্ন সংগঠন। সময়োপযোগী এই বহিষ্কারাদেশের ফলে দলের মর্যাদা ও আদর্শ আরও সমুন্নত থাকবে।

​পতনের ডামাডোলে নতুন অভিযোগ

বহিষ্কারের রেশ কাটতে না কাটতেই নজরুলের বিরুদ্ধে উঠেছে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সিন্ডিকেট পরিচালনার গুরুতর অভিযোগ। সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্য ও শ্যামনগর উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সোলায়মান কবির এই অভিযোগ সামনে এনেছেন।

এসব অভিযোগ ও সাম্প্রতিক বিতর্কের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও গাজী নজরুল ইসলামের মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

​বর্ণাঢ্য অতীত থেকে বিতর্কিত বর্তমান

১৯৫১ সালের ২১ অক্টোবর গাবুরা ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করা গাজী নজরুল ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে জাসদ ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে রাজনীতিতে পা রাখেন। ১৯৭১ সালে ৯ নম্বর সেক্টরে মেজর এম এ জলিলের অধীনে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নেন তিনি।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে জাসদে যোগ দিয়ে প্রথমবার কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হলেও ১৯৮৩ সালে জামায়াতে ইসলামীতে সমর্থক হিসেবে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু করেন।

​ধাপে ধাপে তিনি দলের রোকন, উপজেলা আমির এবং ১৯৯৩ সালে কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১, ২০০১ এবং দীর্ঘ বিরতির পর সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসন থেকে ১ লাখ ৬ হাজার ৯১৩ ভোট পেয়ে তৃতীয়বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন তিনি।

বর্ণাঢ্য এই রাজনৈতিক জীবনে ২০০৭ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় আটবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। এমনকি একটি মামলায় তাঁর স্ত্রী মাকসুদা খাতুন ও কন্যা শারমিন ফেরদৌসীকেও ২৯ দিন কারাবাস করতে হয়েছিল।

​সংসদ সদস্য পদ কি টিকবে?

দলীয় বহিষ্কারের পর এখন শ্যামনগরের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাঁর সংসদ সদস্য পদটি আর বহাল থাকবে কি না। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, কেবল দলীয় বহিষ্কারের ভিত্তিতে সদস্যপদ বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। তবে জাতীয় সংসদ থেকে এ সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

​দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও জীবনের গোধূলি লগ্নে এসে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পতনে শ্যামনগরের রাজনৈতিক মহলে এখন বইছে সমালোচনার ঝড়।

আব্দুল মোমিন/এএস

শেয়ার করুন

এখনই

আরো পড়ুন